চুয়াডাংগা প্রতিনিধি :
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিস্টিলারি কেরু অ্যান্ড কোম্পানি এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। একদিকে ৮৮ বছরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড মুনাফা অর্জন, অন্যদিকে সম্পদ ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন অসংগতি। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১২৯ কোটি টাকা মুনাফা করলেও ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা। যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে সর্বত্রই।
সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির ৩ হাজার ৫৫৬ একর বা ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৬২ হাজার ৬০৪ টাকা। অর্থাৎ, বর্তমান বাজার দরে প্রতি বিঘা জমির মূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৩ টাকায়। যা নিয়ে জনমনে তীব্র বিস্ময় ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, অনেক বছরের পুরোনো পুনর্মূল্যায়নের কারণে এমনটা হয়েছে। নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের বিষয়ে বোর্ডে কথাও হয়। সর্বশেষ অর্থবছরে ৮৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে ১২৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে কেরুজ কমপ্লেক্স। যদিও চিনিখাতে লোকসান হয়েছে। মদ বিক্রির লাভের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটি এই লাভ দেখিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল মনে করে, কেরুর নিজস্ব জমি আর উৎপাদনই তাদের মূল শক্তি। যদি সেগুলোর সঠিক হিসাব না থাকে, তাহলে মুনাফার হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটা নিয়েও প্রশ্ন থাকে।
সম্প্রতি হাবিব সারোয়ার ভুঁইয়া অ্যান্ড কো. নামের একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কেরুজ আর্থিক বিবরণীর এ অসঙ্গতি সামনে আসে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানিটির মালিকানাধীন ৩ হাজার ৫৫৬ একর বা ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৬২ হাজার ৬০৪ টাকা। এতে প্রতি বিঘা জমির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ টাকা, যা বাস্তব বাজার দরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরুজ কমপ্লেক্স ১২৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু এই সাফল্যের বিপরীতে আর্থিক বিবরণীতে নানা গরমিল ও তথ্য ঘাটতি প্রশ্ন তুলেছে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে জমির দাম পুনর্মূল্যায়ন না করা আন্তর্জাতিক হিসাবমানের লঙ্ঘন। কোম্পানিটি তাদের স্থায়ী সম্পদের মূল্য দেখিয়েছে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯৬ টাকা। তবে অডিটের শেষ পর্যায়ে তথ্য সরবরাহ করায় এসব সম্পদ সরেজমিনে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সম্পদের অবস্থান, শনাক্তকরণ নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও অনুপস্থিত ছিল। এ ছাড়া আখসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনকারী গাছ জৈবিক সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করে হিসাবভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে মোট সম্পদের পরিমাণ।
অন্যদিকে মজুদ পণ্য ও স্টোরসামগ্রী নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা। ৭২ কোটি ৭৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৭ টাকার মজুদ পণ্য এবং ৩৪ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬০৪ টাকার স্টোরসামগ্রীর বিপরীতে কোনো পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি রিপোর্ট দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনাধীন পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও নিয়ম না মেনে সমাপ্ত পণ্যের ৮০ শতাংশ ধরে হিসাব করা হয়েছে, যার কোনো বোর্ড অনুমোদন নেই। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের হিসাবে বৈদেশিক ঋণ রূপান্তরে বছরের শেষ দিনের বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়নি। রাখা হয়নি বিলম্বিত করের হিসাবও। পাশাপাশি, আগের বছরগুলোর বার্ষিক রিটার্ন আরজেএসসিতে (প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে কোম্পানির বার্ষিক রিটার্ন দাখিল করতে হয়) জমা না দেয়ায় শেয়ার হোল্ডিং কাঠামো যাচাই করতে পারেননি অডিটকারীরা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি হিসাবের মারপ্যাঁচে কেবল সম্পদ নয়, বঞ্চিত করেছে শ্রমিকদেরও। শ্রমিকদের লভ্যাংশ অংশ গ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) ও কল্যাণ তহবিলের ক্ষেত্রে তারা সুস্পষ্ট অনিয়ম করেছে। ৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬২ টাকার অবণ্টিত অর্থের ওপর শ্রমিকদের সুদ দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। যা শ্রম আইনের লঙ্ঘন। পাশাপাশি এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী, ত্রৈমাসিক ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের জরিমানার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জালিয়াতি বা ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে অসংগতি শনাক্ত করা কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অডিট ফার্ম হাবিব সারোয়ার ভুঁইয়া অ্যান্ড কো.-এর পরিচালক তাহসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কেরুজ কমপ্লেক্সের অডিট কার্যক্রমের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে প্রতিবেদনের বিস্তারিত ও কারিগরি তথ্যের বিষয়ে কথা বলতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট পার্টনারের সঙ্গে দাপ্তরিক সময়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহম্মদ আব্দুছ ছাত্তার বলেন, ‘সম্পদের হিসাব দেয়া হয়নি, এটা সঠিক নয়। তবে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে জমি ও গাছের ক্ষেত্রে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।’
এদিকে কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাব্বিক হাসান এই অসংগতির দায় চাপিয়েছেন পুরোনো হিসাব পদ্ধতির ওপর। তিনি বলেন, অডিটে যেটা বলা হয়েছে, এটা অনেক আগের পুনর্মূল্যায়নের করা। বর্তমান কোম্পানির পুনর্মূল্যায়নের জন্য নতুন করে অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হবে। এ নিয়ে বোর্ডে দুবার আলোচনাও হয়েছে। বোর্ডে পাস হওয়ার পর টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হলে বর্তমান বাজারদরে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
কেরু চিনিকলের এমডি আরও বলেন, ‘আমরা তো খাজনা বর্তমান সরকারি রেটে দিই। রেট কম থাকলে খাজনা কম দিতে পারব, এটার সুযোগ নেই। বর্তমান সরকারি রেটেই আমাদের খাজনা দিতে হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স ও নিয়মিত পরিশোধ করে থাকি।’
ত্রৈমাসিক উৎস করে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে কর অঞ্চল কুষ্টিয়ার পরিদর্শক জাকির হাসান বলেন, ‘নিয়মিত ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়া এবং হিসাবের অসংগতি থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়। বছরে চার বার এ রিটার্ন দিতে হয়। কেরুজ কমপ্লেক্সের ফাইল না দেখে বলতে পারব না সর্বশেষ কী অবস্থা।’