আদালত প্রতিবেদক : রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারধর্ষণের পর হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। নিহতের বাবা-মাসহ আজ মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
আজ ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহন করেন। তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচারক আগামীকাল বুধবার আত্মপক্ষ শুনানির দিন ঠিক করেছেন।
এদিকে, আজ পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় আসামির বলা কথা প্রচার না করতে মিডিয়ার প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।
আজ রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলর বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষ্যগ্রহণ কর্যক্রমের আগে আদালতকে বলেন, আইন অনুযায়ী বিচারকের সামনে ব্যতীত পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় কথা বলার এখতিয়ার আসামির নেই। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা বা দণ্ডিত আসামিদের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার করা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়মানুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা, জনমত প্রভাবিত হওয়া রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন।
তখন আদালত পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় আসামির বলা কথা প্রচার না করতে মিডিয়ার প্রতি নির্দেশনা দেন।
এরপর একে একে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সকাল ১০ টা ৪০ মিনিটের দিকে নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্য দেওয়া শুরুর মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
আজ মধ্যাহ্ন বিরতির আগে ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এরপর ফের ১ টা ৩০ মিনিটের সময় বাকিদের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।
আজ দেওয়া বাকি সাক্ষীরা হলেন নিহতের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুফু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুফা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, চিকিৎসক নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্তকারী কর্মকর্তা, এসআই মো. অহিদুজ্জামান।
আজ সাক্ষী ও নিহতের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষীর জবানবন্দিতে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম। আমার স্ত্রীর পারভীন আক্তারের ফোন পেয়ে আমি দ্রুত বাসায় আসি। এসে বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো দেখতে পাই। আমার স্ত্রী আমাকে জানায় যে, আমাদের ফ্ল্যাটের উল্টা পাশের আসামিদের ফ্ল্যাটে আমার মেয়ে আছে। আমরা দরজা খোলার চেষ্টা করি। কিন্তু দরজাটি ভেতর থেকে লক করা। এরপর হাতুড়ি দিয়ে পেটালে ডোর লকটি খুলে যায়, লকের ছিদ্র দিয়ে আমি এক মহিলাকে দেখি। লোকজন দরজাটা খুলে ফেলে। ভেতরে গিয়ে কমন রুমের দরজার সামনে আমি রক্ত দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, ‘এ রুমে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্ন থাকে। এখান থেকে টয়লেটের ভেতরে রক্ত দেখতে পাই। টয়লেটের ভেতরে মেয়ের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই।’
এরপর দ্বিতীয় সাক্ষি রামিসার মা পারভীন আক্তারের জবানবন্দি শুরু হয়। আদালতের জবানবন্দি দেওয়ার সময় সাক্ষীর কাঠগড়ায় অঝরে কাঁদলেন রামিসার মা। এসময় আদালতের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। তিন্ বলেন, ‘আমি সকালে রান্না করছিলাম। আমার বড় মেয়ে স্কুলে গেলেও ছোট মেয়ে আমি সেই স্কুলে যায়নি। আমি রান্না করে থাকায় রামিসা যে স্কুলে যায়নি এটা বুঝতে পারিনি। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি আমাদের গেট খোলা। বললাম যে মেয়ে দুটো গেটটা খুলে রেখে স্কুলে চলে গেল। রাইসা (বড় মেয়ে) স্কুল থেকে একা আসলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি তুমি একা কেন রামিসা কোথায়? বলে রামিসাতো স্কুলে যায় নাই। এরপর তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করি।’
রামিসার মা বলেন, ‘আসামিদের বাসার গেটের সামনে মেয়ের জুতা দেখি। জোরে জোরে ধাক্কা দিলেও তারা দরজা খোলে না। তখনই আমার সন্দেহ হয়। এরাই কি তবে আমার মেয়েকে আটকে রেখেছে? অনেক লোকজন জড়ো হয়। আমার স্বামীকে ফোন করি। দরজা ভেঙে বাথরুমে গিয়ে দেখি রক্ত আর রক্ত। বাথরুমে মেঝেতে আমার মেয়ের দেহ থেকে মাথা আলগা করা দেখি। এসময় আসামি স্বপ্নাকে বাসায় হাঁটাহাটি করতে দেখি। জড়ো হওয়া মানুষ বলাবলি করেছে, মেয়েটাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।’
এরপর রামিসার বোন রাইসা আক্তারের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ক্যামেরা কোর্টে সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর ভিকটিমের ফুফু মাহমুদা আক্তারের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। পরে সাক্ষী জাকিরুল ইসলাম রাজু ঘটনার ভিডিও করেন, উক্ত ভিডিওতে আসামি স্বপ্নাকে দেখা গেছে মর্মে সাক্ষ্য দেয়। সাক্ষী শেখ আবু সামা আসামি সোহেল রানাকে জানালার গ্রিল দিয়ে বের হয়ে তিনতলা থেকে ওয়াল বেয়ে নিচে নামতে দেখেন। এ সময় তিনি আসামিকে চোর ভেবে ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করেন।
মামলায় সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান সাক্ষ্য দেন। প্রত্যেক সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে আসামি পক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কলিমউল্লাহ তাদের জেরা করেন।
এর আগে আজ সকাল পৌঁনে ৯টার দিকে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়ে। সাক্ষ্ গ্রহণকালে তাদের এজলাসে তোলা হয়।
গতকাল সোমবার মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় একই আদালত। মামলায় সাক্ষ্য দিতে ১৭ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়।
গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।তারা বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলাকেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়।সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলের সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।
মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা, পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান দুইজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।