জনতার পত্রিকা :
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য জিয়াউদ্দিন মাহমুদকে ঘিরে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ। বিষয়টি শুধু একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের প্রশ্ন নয়, বরং প্রশ্ন উঠছে রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরের একটি বড় ব্যবস্থাপনা নিয়েও।
কালবেলার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা ও পূর্বাচল মেগা আবাসন প্রকল্পে জিয়াউদ্দিন মাহমুদ ও তার স্ত্রীর নামে সরকারি প্লট বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের নিয়ম লঙ্ঘন করে মিথ্যা হলফনামার মাধ্যমে এসব প্লট নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর বনানীর ১৮ নম্বর সড়কে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ একাধিক স্থাবর সম্পদের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। আরও দাবি করা হয়েছে, তার স্ত্রীর প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে সলিড গোল্ডবারে রূপান্তর করা হয়েছে।
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিয়াউদ্দিন মাহমুদের দুই ছেলে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় অবস্থান করছেন এবং সেখানে তাদের নামে বা বেনামে সম্পদ কেনার তথ্য অনুসন্ধানে এসেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি কর প্রশাসনকে ঘিরে। ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত করের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, ঘুষের বিনিময়ে কর সুবিধা এবং কর বিভাগে বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে প্রতিবেদনে।
এরই মধ্যে জিয়াউদ্দিন মাহমুদের নাম একটি দুর্নীতি মামলাতেও এসেছে। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ফাউন্ডেশনকে অবৈধ কর সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে দুদকের করা মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১৬ জন এনবিআর কর্মকর্তার মধ্যে তার নাম রয়েছে। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় শত শত কোটি টাকার আত্মসাৎ ও বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অথচ এই একই জিয়াউদ্দিন মাহমুদ একসময় দেশের কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কর আদায় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় ও দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে যদি এত বড় ব্যবধানের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই সম্পদের উৎস কোথায়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে যদি সত্যিই বদলি বাণিজ্য, কর সুবিধা বিক্রি কিংবা সম্পদ অর্জনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে আর কারা জড়িত?
এসব অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত নয়। কিন্তু অভিযোগগুলো যেহেতু সম্পদ, সরকারি প্লট, কর প্রশাসন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর বিষয়কে ঘিরে, তাই নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন অবশ্যই আছে।
কারণ রাজস্ব প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়। এর খেসারত দিতে হয় রাষ্ট্রকে, ব্যবসায়ীকে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাকে।
প্রশ্নটা তাই শুধু জিয়াউদ্দিন মাহমুদের সম্পদের নয়।
প্রশ্নটা হলো, রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের সম্পদের হিসাব রাষ্ট্র কতটা কঠোরভাবে নেয়?