logo

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ০৭:০২ অপরাহ্ণ

ভেড়ামারায় পদ্মার পেটে বসতভিটা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আতঙ্কে জুনিয়াদহবাসী

শেষ আশ্রয়টুকুও হারানোর শঙ্কা—স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর
প্রতিবেদন প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | সময়ঃ ১১:০৮
  • সংবাদ পাঠকঃ ১১৪০ জন
photo

 
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম :
 
ভয়াল পদ্মার গর্জন যেন প্রতিদিনই আরও কাছে আসছে। নদীর স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসছে ভাঙন। একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন, কোথাও আবার নদীর বুকেই হারিয়ে গেছে মানুষের সাজানো সংসারের শেষ স্মৃতিটুকু। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ের মানুষের কাছে এখন প্রতিটি রাতই যেন আতঙ্কের।
যে উঠানে একসময় শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত, সেখানে এখন শোনা যায় পদ্মার উত্তাল স্রোতের গর্জন। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলো ঘর সরিয়ে বারবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এবার তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শেষ আশ্রয়টুকুও কি রক্ষা পাবে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর পদ্মার ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পদ্মাপাড়ে। নদীর তীরবর্তী দরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলোর অনেকেই ইতোমধ্যে জমিজমা ও বসতভিটা হারিয়েছেন। কেউ একাধিকবার ঘর সরিয়েছেন, কেউবা সর্বস্ব হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে কিংবা অনিশ্চিত আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, পদ্মার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাকা রাস্তা ও স্থানীয় অবকাঠামোও। কোথাও নদী এগিয়ে এসে সড়কের বড় অংশ গিলে ফেলেছে, কোথাও ভাঙনের মুখে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এতে শুধু মানুষের বসতভিটাই নয়, শিক্ষা, কৃষি ও যোগাযোগব্যবস্থাও পড়েছে গভীর সংকটে।
ভাঙনকবলিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীভাঙন তাদের কাছে কেবল কয়েক শতক জমি হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, স্মৃতি, জীবিকা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অনেকের সম্বল ছিল সামান্য জমি আর একটি ছোট ঘর। পদ্মার ভাঙনে সেই শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ ও আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “নদী আমাদের সব নিয়ে গেছে। এখন যে জায়গাটুকুতে ঘর আছে, সেটুকুও কখন নদীতে চলে যায়—সেই আতঙ্কে রাত কাটে। আমরা ত্রাণ চাই না, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা চাই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময় বালুর বস্তা বা অন্যান্য সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারেনি। বর্ষা এলেই আবার নতুন করে ভাঙন শুরু হয়। ফলে প্রতিবছরই সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, শুধু ভাঙনের পর জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর গতিপথ ও ভাঙনপ্রবণ এলাকা বৈজ্ঞানিকভাবে জরিপ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদীতীর সংরক্ষণে টেকসই প্রকল্প, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
সবচেয়ে বড় দাবি—জুনিয়াদহ ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, আর কত বসতভিটা নদীতে বিলীন হলে, কত মানুষের কান্না শোনা গেলে এবং কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শুধু কয়েকটি পরিবার নয়, ধীরে ধীরে একটি বিস্তীর্ণ জনপদই অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।
পদ্মাপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা—ভাঙনের পর সাময়িক প্রতিরোধ নয়, এবার প্রয়োজন স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক নদীতীর সংরক্ষণ পরিকল্পনা। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে হয়তো রক্ষা পাবে মানুষের শেষ আশ্রয়, ফসলের মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।

শেয়ার করুন