অনলাইন ডেক্স :
আজ উৎসবের দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। বাংলাদেশে এটি কোরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এ এমন এক উৎসব যা ত্যাগের অপার মহিমায় উদ্ভাসিত। যুগ যুগ ধরে এই ঈদ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত করে আসছে।
চার হাজার বছর আগের ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু— একমাত্র আদরের পুত্র ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। এতে পুত্রেরও সম্মাত ছিল। ইসমাইলের (আ.) এরগলায় ছুড়ি চালাতে পিতা ইব্রাহিত (আ.) উদ্যতও হয়েছিলেন। আল্লাহপাক তাঁর এই চরম আনুগত্য ও ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে তার অশেষ মোজেজায় অলৌকিকভাবে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা প্রতিস্থাপিত করে দেন। ইসমাঈলের পরিবর্তে মহান আল্লাহ ওই দুম্বা কোরবানিই কবুল করে নেন। ইসলামী ঐতিহাসিকদের মতে, এই মহিমান্বিত ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৯শ বা ২০শ শতাব্দীতে)।
মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহতায়ালার প্রতি আনুগত্যের যে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেই আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবেই প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে সারা বিশ্বের মুসলমানরা ঈদুল আজহা উদযাপন করেন এবং পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন।
আমােদর দেশে যেভাবে পালিত হয়
উৎসবের এই দিনের শুরুতেই ভাতৃত্ববোধ উদ্বুদ্ধ হয়ে ধনী আর গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষ ঈদগাহে এককাতারে মিলিত হন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের জামাত আদায় করে গুনাহ মাফের জন্য মহান রবের কাছে দোয়া করবেন। পরিশ্রমের উপার্জনের টাকায় কেনা পশু কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য ফরিয়াদ করবেন। নামাজ শেষে একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে নিজ নিজ আবাসস্থলে ফিরবেন।
ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ হলো পশু কোরবানি। সামর্থবানরা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ ও উট আল্লাহর নামে কোরবানি দিবেন। আর কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করবেন। ইসলামের মহান শিক্ষা—‘প্রতিবেশিকে অভূক্ত রেখে নিজের উদরপূর্তি করো না’। এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে যারা কোরবানি দেয়নি তাদের বাসায় মাংস পাঠিয়ে সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটাবেন।
ঈদুল আজহার তাৎপর্য
ঈদুল আজহা তাই আত্মত্যাগে ডুব দেওয়ার এবং মনের ভেতরের সুপ্ত পশুত্বকে বিসর্জনের দিন। এর শিক্ষা হলো মনের পশুকে জবেহ করে নিজেকে খোদায়ি রঙে সাজিয়ে তোলা। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মনের মাঝে পশু যে তোর আজকে তারে কর্ জবেহ,/ পুল্সেরাতের পুল হতে পার নিয়ে রাখ্ আগাম রসিদ্।’
ঈদুল আজহা সম্পর্কে সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের জবাই করা পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। তিনি দেখেন তোমাদের তাকওয়া। আর এই তাকওয়া হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, নিষ্কৃতি লাভ করা, ভয় করা। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় এবং তাঁর সন্তুষ্টিলাভের আশায় অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দের কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
ঈদের প্রধান জামাত
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।এই প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতাসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নেবেন। ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় বিশেষ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
আবহাওয়া বিরূপ থাকলে এবং এ কারণে জাতীয় ঈদগাহে জামাতের আয়োজন সম্ভব না হলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় এ পবিত্র ঈদুল আজহার পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৭টায়। এরপর সকাল ৮টা, ৯টা, ১০টা এবং বেলা পৌনে ১১টায় বাকি জামাতগুলো হবে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টা ও সাড়ে ৮টায় দুটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সলিমুল্লাহ মুসলিম হল মসজিদে সকাল ৭টায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল লনে সকাল ৮টায় এবং ফজলুল হক মুসলিম হল মাঠে সকাল ৮টায় ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়েছে।এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হবে
ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান ও দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ময়দানে দেশের বড় জামাতগুলো হয়ে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে, ভিন্ন জেলা থেকেও মুসল্লিরা শরিক হন এসব ঈদের জামাতের মহামিলনে।
ঈদের ছুটি
এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের মানুষ মেতে উঠেছে এক দীর্ঘ ছুটির আমেজে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ২৫ মে থেকেই এই ছুটির সূচনা হয়েছে, যা আগামী ৩১ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে। ঈদের মূল ছুটির পাশাপাশি সরকারের নির্বাহী আদেশে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত হওয়ার কারণেই এবার দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই দীর্ঘ ছুটির সুযোগ উপভোগ করছেন।
ঈদের আনুষ্ঠানিকতা
ঈদ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পৃথক বাণীতে তারা দেশবাসীর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঈদুল আজহার শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে টেলিভিশন ও রেডিওতে সম্প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্র আয়োজন করেছে বিশেষ সংখ্যার। ঈদের দিন সরকারিভাবে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে উন্নতমানের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে। ঈদের ছুটিতে পাঠক যেন তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে বঞ্চিত না হন, এ জন্য ছাপা সংবাদপত্র বন্ধ থাকলেও চালু থাকছে অনলাইনগুলো। এই ঈদে ছুটির পাঁচ দিনই দৈনিক আমাদের সময় অনলাইন সংবাদ পরিবশেন করবে।