প্রযুক্তি বিস্তারের লাভ ক্ষতি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার্থে এখনই ভাবতে হবে


 
:  মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল : 
 
একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে আজকের শিশুরা কীভাবে বেড়ে উঠছে তার ওপর। শিশুর মানসিক বিকাশ, জ্ঞানচর্চা, কল্পনাশক্তি, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতা গড়ে তুলতে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। অথচ প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের একটি বড় অংশ ক্রমেই বই ও শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কনটেন্ট তাদের মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। বিষয়টি এখন আর শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
 
শিশুকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তার হাতে বিকল্প হিসেবে দিতে হবে আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় শিক্ষা। শিশুর জন্য বই পড়াকে আনন্দের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বয়স ও শ্রেণিভিত্তিক পাঠাগার গড়ে তোলা, নিয়মিত বই পড়ার সময় নির্ধারণ, বই পড়া ও গল্প বলার প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং ভালো বই পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
 
শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পাঠ্যবই পড়ে শোনানো বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার প্রস্তুতি দেওয়াই শিক্ষা নয়। একজন শিক্ষককে শিশুর কৌতূহল জাগাতে হবে, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং পাঠকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আনন্দময়, অংশগ্রহণমূলক ও শিশুবান্ধব পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে শ্রেণিকক্ষই হয়ে উঠতে পারে শিশুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা।
 
শিক্ষকদেরও তাই ক্লাসে শেখানোর বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ, হাতে-কলমে শিক্ষা, দলীয় কাজ, গল্প ও উদাহরণের মাধ্যমে পাঠদান—এসব পদ্ধতি শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
 
অন্যদিকে, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের বিষয়টি এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়; বরং বয়স অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বাস্তবমুখী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। শিশুদের জন্য ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, ছবি আঁকা, সংগীত ও বই পড়ার মতো সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিশুর অবসর যেন কেবল একটি স্ক্রিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে ব্যবস্থা পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ—তিন পক্ষকেই সম্মিলিতভাবে করতে হবে।
 
এখানে অভিভাবকদের দায়িত্বও কম নয়। শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বাবা-মাকেও সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা, বই পড়া, খেলাধুলা করা এবং তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি হলে শিশুর মধ্যেও বইয়ের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হবে।
 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শিশুকে শুধু পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। আজকের শিশু আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের চিন্তাশক্তি, মননশীলতা, মানবিকতা ও সৃজনশীলতা যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর।
 
তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে, শিক্ষকদের শ্রেণিকেন্দ্রিক হতে হবে, বিদ্যালয়কে আনন্দময় শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে এবং অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বই, পাঠাগার, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে।
 
শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে একটি বই দেওয়া নয়; তার হাতে ভবিষ্যতের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া। আর শ্রেণিকক্ষে তার মনোযোগ ধরে রাখা মানে একটি প্রজন্মের চিন্তার ভিত শক্ত করা। মোবাইল ও প্রযুক্তির যুগে শিশুদের সঠিক পথ দেখাতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে জাতিকেই।
 
পরবর্তী প্রজন্মকে জ্ঞাননির্ভর, মানবিক ও সৃজনশীল করে গড়ে তুলতে হলে আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—শিশুর হাতে থাকবে বই, শ্রেণিকক্ষে থাকবে মনোযোগ, প্রযুক্তি থাকবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনের মধ্যে। তা না হলে প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে গিয়েও জ্ঞান ও মননের দিক থেকে একটি জাতি পিছিয়ে পড়তে পারে। 
 


Email: bijoynews24bd@gmail.com

প্রকাশকঃ রোকমুনুর জামান রনি

সম্পাদকঃ শামসুল আলম স্বপন

ফোনঃ 01716954919 / 01722158130

যোগাযোগঃ A-231 Housing Estate, Kushtia-7000.

© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।