প্রতিবেদন প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, সময়ঃ ০৯:৪৮
ঢাকা অফিস :
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় মালয়েশিয়া প্রবাসীর স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ে জড়িত অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. আব্দুর রউফ এবং মো. আল আমিন হোসেন শান্ত। তারা বিমানবন্দর থানা এলাকার বাসিন্দা। গত ২৮ আগস্ট রাতে তাদের গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়েছে। গতকাল রবিবার ওই দুই ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ওই দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে বিমানবন্দর এলাকায় স্বর্ণ, ডলার ও টাকা ছিনতাইয়ে একটি চক্র গড়ে উঠেছে।
এই চক্রে নারী সদস্যও রয়েছে। বিদেশ ফেরত যাত্রীরা এই চক্রের বড় টার্গেটে থাকে।
পুলিশের তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী যাত্রীদের টার্গেট করে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিমানবন্দরের ভেতর ও আশপাশের এলাকায় ঘোরাফেরা করে বিদেশফেরত যাত্রীদের গতিবিধি লক্ষ করে একটি চক্র। সঙ্গে স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে এমন যাত্রীদের শনাক্ত করার পর কৌশলে অনুসরণ করে চক্রটি। পরে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বর্ণ ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে চক্রটি। এই চক্রটিকে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিমানবন্দর থানাপুলিশ।
মালয়েশিয়া প্রবাসী আবদুল কাউসার তার বোনের বিয়ের জন্য ২০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার পাঠান আরেক মালয়েশিয়া প্রবাসীর কাছে। পরে ওই প্রবাসী ২৮ আগস্ট রাতে শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে ওই স্বর্ণালংকার কাউসারের ভাই মো. সুমনের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে মো. সুমন ও তার সঙ্গে থাকা রোহান চৌধুরী ওই স্বর্ণালংকার নিয়ে রাত ৮টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হন। তাদের একজনের কাছে ১০০ গ্রাম এবং অন্যজনের কাছে ১০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিল।
তারা বিমানবন্দর থেকে হায়েস গাড়িতে করে যাওয়ার সময় রাত সোয়া ৮টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বলাকা ভবনের বিপরীত পাশে তারা গাড়ি থেকে নামেন। এ সময় কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরেন। এ সময় কয়েক ছিনতাইকারী ওই দুজনকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোক এবং তাদের কাছে বোমা রয়েছে বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এক পর্যায়ে সুমন ও রোহানকে এলোপাতাড়ি মারধর করে তাদের কাছে থাকা ২০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার ছিনতাই করে। এই ছিনতাইয়ের দৃশ্য মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করেন একটু দূরে দাঁড়ানো আরেক ব্যক্তি। ভুক্তভোগীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় সুমন ও রোহান চৌধুরী ঘটনার ভিডিওটি সংগ্রহ করে বিমানবন্দর থানাপুলিশের শরণাপন্ন হন। এই ভিডিওর সূত্র ধরেই পুলিশ ঘটনার রাতেই উত্তরা এক নম্বর সেক্টর থেকে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশ তাদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারে। গ্রেপ্তারকৃতরা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা। দুজনের মধ্যে আবদুর রউফের কাছ থেকে পুলিশ একশ গ্রাম স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে।
এদিকে ঘটনাটি ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে তারা সরকারের দায়িত্বশীলদের বিষয়টি জানান। এ সময় সরকারের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ঘটনার বিষয়ে ২৯ আগস্ট ভুক্তভোগী মো. সুমন বাদী হয়ে ওই দুই নেতাসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনের বিরুদ্ধে একটি ছিনতাই মামলা করেন। ওই মামলার এজাহারে ছিনিয়ে নেওয়া ২০০ গ্রাম স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৪০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর প্রবাসী যাত্রীদের অনুসরণ করে ছিনতাইয়ের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছে কিনা, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এর আগে বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনায় তারা জড়িত ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার বাদী সুমন বলেন, ‘আমার বড় ভাই কাউসার মালয়েশিয়ায় থাকেন। বোনের বিয়ে ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য তিনি ২০০ গ্রাম স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণ নিয়ে ভাড়া করা হায়েস গাড়িতে করে বের হওয়ার পর বলাকা ভবনের বিপরীত পাশে রাস্তায় পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা আমাদের ঘিরে ধরে। পরে সবকিছু নিয়ে যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ বলেন, আমরা বেশ কয়েক দিন ধরেই এ চক্রটি ধরার চেষ্টা করছি। সর্বশেষ শুক্রবারের ঘটনাটি সামনে এলে তৎপরতা বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে শনিবার চক্রের দুই সদস্যকে আটক করা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আরও কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ঘোরাফেরা নতুন নয়। বিশেষ করে বিদেশফেরত যাত্রীদের গতিবিধি লক্ষ্য করে কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ঘোরাফেরা করেন। যাত্রীর সঙ্গে স্বর্ণ বা মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে এমন তথ্য পাওয়ার পর তাদের পিছু নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর কাওলা, খিলক্ষেত, জসীমউদ্দীন রোডসহ আশপাশের এলাকায় এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে স্বর্ণ নিয়ে দেশে ফেরা যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।