প্রতিবেদন প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, সময়ঃ ১১:৫৩
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করা হাজারো অভিবাসীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার শত শত অভিবাসী সেউতার একটি সমুদ্রসৈকতে অস্থায়ী শিবির গড়ে তুলেছেন।
স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনে প্রায় ৬৯ হাজার ৫০০ জন অভিবাসীকে মরক্কোতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, গত বৃহস্পতিবার সেউতায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রবেশ করেছিলেন। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এ সংকটে স্পেনের সীমান্ত অংশে এখন পর্যন্ত ৭২ জন এবং মরক্কোর অংশে ১১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অনেক অভিবাসী জানান, দোকানপাট বন্ধ থাকায় তারা খাবারের সংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয়দের বিরূপ আচরণ এবং স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যেতে না পারায় তারা সেউতায় আটকে রয়েছেন।
মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল। ইউরোপে প্রবেশের আশায় অভিবাসীরা নিয়মিত এসব সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেন।
রয়টার্সের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, এল ট্রাম্পোলিন সৈকতে অধিকাংশই সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শত শত অভিবাসী বালুর ওপর শুয়ে আছেন। ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে অনেকেই শরীরে তোয়ালে জড়িয়ে রেখেছেন। সৈকতের পাশের সড়কে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যানবাহল টহল দিতে দেখা যায়।
সেউতার প্রশাসনিক প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস জানান, বর্তমানে ছিটমহলটিতে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য থাকা দুটি অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রই কার্যত ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা আলবার্তো গাইতানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৬২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলছে। আন্তর্জাতিক ও স্প্যানিশ আইনের আওতায় তারা বহিষ্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা ভোগ করেন।
অভিবাসী সংকটকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে আবারও অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত নীতি নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও বেড়েছে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, অতীতে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ অভিবাসী সংকটে পড়লে স্পেন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এবার স্পেনও অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সমর্থন প্রত্যাশা করছে।
পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার ইইউ সদস্য দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠক ডাকা হয়েছে।
এদিকে আলবারেস ইতালির সরকারের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
আলবারেস আরও জানান, সংকটের শুরু থেকেই মরক্কো সীমান্ত পুলিশ দিয়ে সহযোগিতা করেছে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই অধিকাংশ অভিবাসীকে দ্রুত ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
তবে সেউতার প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস ভিন্ন অবস্থান নেন। তার অভিযোগ, মরক্কো এমন একটি পরিস্থিতি ঘটতে দিয়েছে, আর তাই দেশটিকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা কঠিন।
তিনি স্প্যানিশ দৈনিক এল পাইসকে বলেন, ‘মরক্কো আমাদের দেখিয়েছে যে তারা নির্ভরযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অন্যদিকে মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করে স্পেনের একটি আদালতের রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস ও কাদেনা সের জানিয়েছে, স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মরক্কো গণহারে সীমান্ত পারাপারের পরিকল্পনা করেনি, তবে ঘটনাটি ঘটতে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসজুড়ে মরক্কো ধীরে ধীরে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে। পরে দেশটির থ্রোন ডে উদযাপনের সময় বিপুল জনসমাগম তারাখাল সীমান্তের দিকে এগিয়ে এলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যত তুলে নেওয়া হয়।
এদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা জানান, সীমান্তে এত বড় ঢলের বিষয়ে দেশটির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা (সিএনআই) তাকে আগাম সতর্ক করেনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা গুরুত্বহীন বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিতা রোবলেস গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, গোয়েন্দা কার্যক্রম গোপনীয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী এ সংকট মোকাবিলায় অসাধারণ কাজ করেছে।
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।