প্রতিবেদন প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, সময়ঃ ১০:২১
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি কার্যত বহাল থাকলেও উভয় পক্ষের নতুন করে সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলা চলেছে। একই সময়ে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য কাটেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে একটি ‘খুব ভালো চুক্তি’ করার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তবে নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সেই আশাবাদ বারবার ধাক্কা খাচ্ছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বার্তা সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা হবে না। তাসনিম আরও জানিয়েছে, ইরান ও তাদের মিত্র ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করার পাশাপাশি
বাব আল-মান্দেব প্রণালিসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ফ্রন্ট সক্রিয় করার কৌশল গ্রহণ করেছে। যদিও এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে তারা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর উড়তে থাকা একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তাদের যুদ্ধবিমান ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি আক্রমণাত্মক ড্রোন ধ্বংস করেছে, যা আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা এমন একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে যেখান থেকে হরমোজগান প্রদেশের সিরিক দ্বীপের একটি যোগাযোগ টাওয়ারে আক্রমণ চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি ঘাঁটির অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে একই সময়ে কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। মার্কিন সেন্টকম পরে দাবি করে, কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করে যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়, তাহলে সেসব ঘাঁটি ও সামরিক সম্পদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বৈধ অধিকার তেহরানের রয়েছে।
ইরানের হামলাকে ‘জঘন্য ও পুনরাবৃত্ত আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কুয়েত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের হামলা কুয়েতের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন।
সৌদি আরবও কুয়েতের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রিয়াদ বলেছে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি শুরু থেকেই নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধবিরতির দুই দিনের মাথায় কুয়েত তাদের আকাশসীমায় সাতটি ড্রোন প্রবেশের অভিযোগ তোলে। এরপর ১৮ এপ্রিল হরমুজ প্রণালিতে দুটি ভারতীয় জাহাজের ওপর গুলি চালায় ইরানি বাহিনী। ২০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি কনটেইনার জাহাজ আটক করলে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
২২ এপ্রিল আইআরজিসি তিনটি জাহাজে গুলি চালিয়ে দুটি বিদেশি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে। মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ ওঠে। ২৮ মে সেন্টকম জানায়, তারা পাঁচটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং বন্দর আব্বাসে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে। এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দেশটির বন্দরগুলো কার্যত অবরোধ করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিকে ইরানি মাইনমুক্ত করারও উদ্যোগ নিয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, শুক্রবার গাম্বিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের দিকে যাওয়ার সময় তার ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি অবরোধ লঙ্ঘন করছিল। অবরোধ শুরুর পর এ পর্যন্ত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল এবং শতাধিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের অনুমতি নিয়ে চারটি তেলবাহী ট্যাংকারসহ ১৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তারা সতর্ক করেছে, ‘শত্রু শক্তির’ সঙ্গে সহযোগিতা করলে সেটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার কেবল ইরান ও ওমানের রয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত এবং পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি খসড়া চুক্তিতে নতুন কিছু পরিবর্তন যুক্ত করে তা পুনরায় তেহরানে পাঠিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, পরিবর্তনগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে আরও শক্তিশালী নিশ্চয়তা আদায় করা।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায় এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের মিত্রদের জন্য ভালো হবে।’
তবে আলোচনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অচলাবস্থা রয়ে গেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস করবে। কিন্তু তেহরান বলছে, বর্তমান আলোচনায় তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিস্তারিত কোনো বিষয়ই আলোচনার টেবিলে নেই।
একইভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও আর্থিক সুবিধা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, অর্থ বিনিময়ের কোনো আলোচনা হয়নি। বিপরীতে ইরান বলছে, অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, তেহরানের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি অনুমোদন করা হবে না। তার ভাষায়, ‘শত্রুর কথা ও প্রতিশ্রুতির ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। দৃশ্যমান ও বাস্তব অর্জনই আমাদের একমাত্র মানদণ্ড।’
গালিবাফ আরও অভিযোগ করেছেন, ইরানি বন্দর অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কোনো জল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ‘সব ফ্রন্টে’, অর্থাৎ লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপ করে শান্তি প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও তাদের অংশীদাররা প্রস্তুত রয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে তেহরানকে ‘সর্বোচ্চ নমনীয়তা’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
হরমুজ প্রণালিতে সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট জানিয়েছেন, ফেডারেল সরকার ও বেসরকারি খাতের হাতে এখনও বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুদ থেকে এক সপ্তাহে আরও ৯.১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের রেকর্ড হ্রাস। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় মূল্য প্রতি গ্যালন ৪.৩৪ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও এটি আগের সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কম, যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় এখনও প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সাউফান সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক কলিন ক্লার্ক মনে করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতাই ইরানের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত অস্ত্র। তার মতে, ‘ইরান জানে এটি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী তাস। উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা এবং প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।’
অন্যদিকে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোরতাজাভি বলেছেন, ধারাবাহিক সামরিক হামলা, পূর্ববর্তী চুক্তি ভঙ্গ এবং আলোচনার মাঝেই সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের আস্থা প্রায় বিলুপ্ত। তার ভাষায়, ‘ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন, তারা আলোচনার টেবিলে বসলেও যে কোনো মুহূর্তে আকাশ থেকে বোমা পড়তে পারে।’
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।